কোরিয়ায় প্রথমবার খেতে গিয়ে দেখি টেবিলজুড়ে ছড়ানো আটটা ছোট ছোট প্লেট — আর আমি একটাতেও হাত দিইনি।

দাম মেটাতে পারব কি না, ভরসা পাচ্ছিলাম না।

গুনে দেখেছিলাম, সত্যিই

কিমচি, বিন স্প্রাউট, পালং শাক, মুলা কুচি, ডিমের রোল, ভাজা অ্যানচোভি, ফিশ কেক, আর কালো মতো কী একটা — চিনতেই পারিনি।

অর্ডার দিয়েছিলাম একটা বিবিমবাপ। এল আটটা প্লেট। মেনুটা আবার দেখলাম। বিবিমবাপ, ৯,০০০ ওন। লেখা ছিল ওইটুকুই।

তাহলে এই আটটার দাম কত?

বিল কত আসবে কোনো ধারণাই নেই, তাই হাতই দিলাম না। বিবিমবাপটুকু খেয়ে বেরিয়ে এলাম।

বেরোনোর সময় এক কর্মী প্লেটগুলোর দিকে তাকিয়ে আমাকে কী যেন জিজ্ঞেস করলেন। সম্ভবত জানতে চাইছিলেন খাবারটা মুখে রোচেনি কি না — কিন্তু তখন কিছুই বুঝতাম না, তাই শুধু হেসে বেরিয়ে গেলাম।

পানির দাম নিয়েও দুশ্চিন্তায় ছিলাম

পানির গল্পটাও এক। মেনুতে পানি নেই, তাই ধরে নিলাম আলাদা করে অর্ডার দিতে হয় বুঝি।

এই জায়গাটায় একটু ব্যাখ্যা দরকার: জার্মানিতে পানি ফ্রি না। রেস্তোরাঁয় পানি চাইলে বোতল আসে, আর তার বিলও আলাদা। ট্যাপের পানি চাইলে অনেক জায়গায় দেয়ই না।

তাই পানির বিল নিয়ে আমার দুশ্চিন্তাটা অদ্ভুত কিছু ছিল না — আমি স্রেফ জার্মান হিসাবে ভাবছিলাম।

কিন্তু বসতে না বসতেই কর্মী একটা জগ আর কাপ আমার টেবিলে রেখে চলে গেলেন। আমি তো কিছুই অর্ডার করিনি।

এটাও বিলে উঠবে ভয়ে অনেকক্ষণ ছুঁইনি। সামনে এক কাপ পানি রেখে বসে বসে বিবিমবাপ খাচ্ছি।

পরে জানলাম। পানিটা এমনিই দেয়। বসলেই চলে আসে, আর তার গায়ে কখনোই কোনো দাম বসে না।

কোনো কোনো দোকানে বদলে এক পাশে ওয়াটার ডিসপেনসার রাখা থাকে, সবাই নিজে নিজে ঢেলে নেয়। সেক্ষেত্রে কাপগুলো ডিসপেনসারের পাশেই স্তূপ করা — গিয়ে ঢেলে নিয়ে এসো। যেভাবেই হোক, টাকা লাগে না।

আমার লেগেছিল প্রায় দুই মাস

এক কোরিয়ান বন্ধুর সঙ্গে খাচ্ছিলাম, ও একটা 반찬 (বানচান) — মানে সাইড ডিশ — শেষ করে কর্মীকে ডেকে আরও চেয়ে নিল।

"ওটার জন্য বাড়তি টাকা লাগে না?" — জিজ্ঞেস করলাম।

ও হেসে বলল, "ফ্রি। আরও দেওয়াটাই তো নিয়ম।"

দুই মাস ধরে 반찬 প্রায় ছুঁইইনি শুনে ও সত্যি সত্যি আমার জন্য মন খারাপ করল। "ওগুলো তো খাওয়ার জন্যই দেয়..."

আমি যা ভেবেছিলামবাস্তব
বানচান হলো আলাদা বিল হওয়া অ্যাপেটাইজারমেইনের দামের মধ্যেই ধরা। বাড়তি চার্জ নেই
পানি অর্ডার দিয়ে কিনে খাওয়ার জিনিসফ্রি। টেবিলে এনে দেয়, নয়তো ডিসপেনসার থেকে সেল্ফ-সার্ভ
শেষ হলে ব্যস, ওখানেই শেষআরও চাইলে আরও দেয়
টিপস কত দেব?টিপসের সংস্কৃতিই নেই

আরও বানচান চাইবে কীভাবে

반찬 더 주세요
banchan deo juseyo
সাইড ডিশ ফুরিয়ে গেলে। এতে কোনো টাকা লাগে না

এটা বললেই সঙ্গে সঙ্গে আবার ভরে দেয়। এতটুকুও অস্বস্তি বোধ করার দরকার নেই।

তবে ব্যাপারটা সর্বত্র এক না। বারবিকিউ দোকানের লেটুস পাতা, বা সেল্ফ-সার্ভ বার আছে এমন জায়গায় কখনো কখনো রিফিল থেকেই টাকা নেয়। সেসব জায়গায় সাধারণত নোটিশ ঝোলানো থাকে, এক নজরেই বুঝে যাবে।

এটা জানার পর আমার বাইরে খাওয়াদাওয়াটাই পুরো পাল্টে গেল। আগে শুধু মেইনটা খেয়ে উঠে যেতাম; এখন শুরুই করি 반찬 দিয়ে।

ভাবতাম, ফ্রি কেন

খোঁজ নিয়ে দেখলাম, কোরিয়ান খাবার টেবিলের গড়নটাই আসলে এমন।

একটা মেইন ডিশ একা একা আসে না — ভাত আর স্যুপের সঙ্গে কয়েক রকম সাইড ডিশ সাজিয়ে দেওয়া হয়, আর সবকিছু থেকে একটু একটু করে মিলিয়ে খেতে হয়। তাই 반찬 কোনো বোনাস না; ওগুলো টেবিলেরই অংশ। ওগুলো সরিয়ে নিলে সেটা আর ঠিকঠাক খাবারই থাকে না — সে কারণেই ওদের গায়ে আলাদা দাম বসে না।

এটা বোঝার পর বরং কিছু ফেলে রেখে উঠতেই খারাপ লাগা শুরু হলো।

টিপসও নেই

এটা নিয়েও প্রথমে অনেক মাথা খারাপ করেছি। বিল মিটিয়ে ওপরে আর কত রেখে যাব?

জার্মানিতে সাধারণত ৫–১০% রেখে যাই। খুচরোটা রেখে দিতে বলি, নয়তো দেওয়ার সময় অঙ্কটা গোল করে বাড়িয়ে বলি। এত গভীরে গেঁথে আছে যে কোরিয়াতেও মনে মনে হিসাবটা কষেই যাচ্ছিলাম।

কোরিয়ায় টিপসের সংস্কৃতি নেই। রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, ট্যাক্সি — কোথাও না। লেখা দামটাই তোমার পুরো খরচ, ট্যাক্সও তার মধ্যেই ধরা। দামি হোটেল আর কিছু রেস্তোরাঁয় সার্ভিস চার্জ যোগ হয় বটে, কিন্তু সেটা আগে থেকেই বিলে ছাপা থাকে — ওটা আমার ঠিক করার বিষয়ই না।

একবার তবু বাড়তি রেখে আসতে গিয়েছিলাম, কর্মী হকচকিয়ে গিয়ে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তখনই পাকাপাকি বুঝে গেলাম।

계산할게요
gyesanhalgeyo
বেরোনোর পথে কাউন্টারে বলবে। টেবিলে বসে করার জিনিস না

বিল সাধারণত বেরোনোর পথে কাউন্টারে মেটাতে হয়। টেবিলে না।

এখন পেছন ফিরে দেখলে

সবচেয়ে আফসোস হয় 반찬 না খেয়ে কাটানো ওই দুই মাসটার জন্য। ওটাই তো কোরিয়ান খাবার টেবিলের সবচেয়ে মজার অংশ।

না-জানার লোকসান বলে যে একটা জিনিস আছে — এই তাহলে সেটা, ভেবেছিলাম। কেউ একজন একটা বাক্য বলে দিলেই হয়ে যেত।

তোমার প্রথম কোরিয়া সফরেও কি এমন কিছু ছিল? স্রেফ না-জানার কারণে হাতছাড়া হওয়া কিছু? থাকলে বোলো — অন্তত জানব, বোকামিটা আমি একাই করিনি।