সত্যি কথাটাই বলি।
এক মাস ঘুরে বেড়িয়েছি, আর পুরোটা সময় যাতায়াতে ডাবল ভাড়া দিয়ে গেছি। নিজেও জানতাম না।
কিছু একটা যে গোলমাল, টের পাচ্ছিলাম
কোরিয়ায় আসার সপ্তাহ তিনেক পরে খেয়াল করলাম, আমি আবার কার্ড রিচার্জ করছি। আবারও।
হিসাব কষে দেখলাম: সপ্তাহে ৩০,০০০ ওনের বেশি যাচ্ছে। অথচ দিনে আমার যাতায়াত বলতে একটা বাস আর একটা সাবওয়ে। সিউলে থাকা এক বন্ধু বলল, তার মাসে যায় ৫০,০০০-এর মতো।
আমি রোজ বাইরে বেরোই — সেটা মেনে নিয়েও অঙ্কটা বড্ড বেশি।
ভাবলাম, জিনিসপত্রই বুঝি দামি। সিউল বলে কথা!
বন্ধুর একটাই প্রশ্ন
একদিন দুজন একসঙ্গে বাসে চড়লাম, আর নামার পথে ও পেছনের দরজার রিডারে কার্ডটা ছোঁয়াল।
"ওটা ছোঁয়ালে কেন?" — জিজ্ঞেস করলাম।
ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল: "তুমি এতদিন নামার সময় ছোঁয়াওনি?"
ওর মুখটা এখনো মনে আছে। যেন চোখের সামনে কোনো বিপর্যয় ঘটতে দেখছে — সেই মুখ।
আমি কী মিস করছিলাম
কোরিয়ার বাস হলো দুই-ট্যাপের সিস্টেম। ওঠার সময় একবার, নামার সময় একবার।
নামার সময় না ছোঁয়ালে সিস্টেম জানতেই পারে না তুমি কোথায় নেমেছ। ফলে ট্রান্সফার ডিসকাউন্ট আর চালুই হয় না।
বাস থেকে নেমে ৩০ মিনিটের মধ্যে সাবওয়েতে উঠলে বাড়তি ভাড়া প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। আর আমি? প্রতিবার একদম গোড়া থেকে ভাড়া দিয়ে গেছি। দিনে দু-তিনবার করে, পুরো এক মাস।
রাতের বেলায় নিয়মটা একটু উদার: রাত ৯টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে সময়সীমাটা বেড়ে এক ঘণ্টা হয়ে যায়।
| আমি যা করছিলাম | আসলে যা ঠিক |
|---|---|
| ওঠার সময় ছুঁইয়ে, নামার সময় হেঁটে বেরিয়ে যাওয়া | ওঠার সময় ছোঁয়ানো, নামার সময় আবার ছোঁয়ানো |
| প্রতিবার বদলানোর সময় পুরো ভাড়া | ৩০ মিনিটের মধ্যে বদলালে প্রায় বিনা খরচে |
পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, নামার ট্যাপ বাদ দিলে শুধু ডিসকাউন্ট হারানোতেই শেষ না। কোথায় নেমেছ সিস্টেম জানে না বলে ওই রুটের সর্বোচ্চ ভাড়াটাই কেটে নেয়। পরপর দু'বার মিস করলে কার্ডটা এক দিনের জন্য সাসপেন্ডও হয়ে যেতে পারে।
প্রথমে একটু কড়া মনে হয়েছিল, কিন্তু ভেবে দেখলে — না-ছুঁইয়ে নেমে যাওয়া আটকানোর এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী।
নামাটাই আবার আলাদা এক কাজ
ট্যাপের ব্যাপারটা জানার পর হাজির হলো পরের সমস্যা। রিডার পর্যন্ত পৌঁছানোই কঠিন।
কোরিয়ার বাসে নামতে হয় পেছনের দরজা দিয়ে, আর নিজের স্টপের ঠিক আগে উঠে দাঁড়ালে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ঠাসাঠাসি ভিড়ের বাসে শুধু পেছনের দরজা অবধি যেতেই অনেকটা সময় লাগে।
তাই এক স্টপ আগে বেল টিপে আগেভাগেই পেছনের দরজার দিকে এগোতে শুরু করতে হয়।
আমি এটা জানতাম না বলে প্রথম দিকে "sorry, sorry" বলতে বলতে ঠেলে ঠেলে যেতাম। এখন ভাবলে হাসি পায়। তখন কিন্তু ঘাম ছুটে যাচ্ছিল।
এই একটা কথা বললেই লোকজন নিজে থেকেই সরে জায়গা করে দেয়। জোরে বলারও দরকার নেই।
আর যখন বেল টেপা মিস হয়ে গেছে আর দরজা প্রায় বন্ধ হতে চলেছে, তখনকার জন্য আছে এটা।
একবার বেল টিপতে না পেরে এটা চেঁচিয়ে বলেছিলাম, আর ড্রাইভার আমার জন্য দরজাটা আবার খুলে দিলেন। সেদিন থেকে আমি বেল টিপি আগেভাগেই।
শেষ সপ্তাহটা
একবার জেনে যাওয়ার পর, নামার সময় হাত আপনা থেকেই রিডারের দিকে চলে যেত।
রিচার্জের ছন্দটাও সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। আগে চার দিন পরপর টাকা ভরতাম। শেষ সপ্তাহটা চলে গেল একবারের রিচার্জেই।
গোটা একটা মাস জলে গেল, আর শুধু শেষ সপ্তাহেই যেমনভাবে চড়ার কথা, তেমনভাবে চড়লাম।
তা — কোরিয়ায় তোমারও কি এমন কিছু হয়েছিল? স্রেফ না-জানার কারণে টাকা গচ্চা যাওয়ার কোনো ঘটনা? আমি একা নিশ্চয়ই না।



